দেশের সরকারি পরিসংখ্যান প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটি দেশের জনমিতি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জেন্ডার, কৃষিসহ অর্থনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ সূচকের পরিস্থিতির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করে। তবে দীর্ঘকাল ধরেই সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। কারণ পরিসংখ্যানগুলোয় বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় কদাচিৎ। এর অন্যতম কারণ ছিল পরিসংখ্যানগুলোর অতিমাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ। সরকারি তথ্য প্রভাবিত করার কাজটি সবচেয়ে বেশি হয়েছে বিগত সরকারের আমলে। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, দেশে বানোয়াট পরিসংখ্যান বানানোর কাজটি করা হতো বিগত সরকারের সাবেক একজন পরিকল্পনামন্ত্রীর নেতৃত্বে। মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে পাঁচ-ছয়জনের একটি সিন্ডিকেট। অভিযোগ উঠতে থাকে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গেও বাড়তে থাকে পরিসংখ্যানগত ব্যবধান। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বিগত সরকার সংস্থাটিকে ব্যবহার করে জনসংখ্যা, জিডিপির আকার-প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই ভুল ও প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যান তৈরি ও উপস্থাপন করেছে।
এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান তৈরির জোর দাবি ওঠে। যদিও এ সরকারের দায়িত্ব নেয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিবিএসের পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারেনি। সংস্থাটি জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও এমন পরিসংখ্যান প্রকাশ করে যাচ্ছে, যা নিয়ে মানুষ এখনো সন্দিহান। সম্প্রতি আগস্টে মূল্যস্ফীতির হার প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। সেটি নিয়ে আবারো সমালোচনার মুখে পড়েছে। সরকার তথ্যের প্রতি আস্থা ফেরানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ এ পর্যন্ত নিতে পারেনি।
যদিও বিবিএসের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে স্বল্প পরিসরে হলেও এরই মধ্যে কিছু কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কোরিয়ার অর্থায়নে আধুনিক ডাটা ওয়্যারহাউজ স্থাপন করতে যাচ্ছে বিবিএস। এটি স্থাপন হলে পরিসংখ্যান পরিষেবার সক্ষমতা বাড়বে। বিবিএসের ডাটায় সবাই প্রবেশাধিকার পাবে। জিডিপি হিসাব প্রাক্কলন, মূল্যস্ফীতির তথ্য-উপাত্ত কিংবা নিজস্ব জরিপ প্রতিবেদন এখন থেকে যাতে বিবিএস স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে সেজন্য এ বছরের মে মাসে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে যেকোনো তথ্য প্রকাশে এখন থেকে মন্ত্রী, উপদেষ্টা কিংবা সরকারের ঊর্ধ্বতন কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও স্বাক্ষর নেয়ার কোনো প্রয়োজন পড়বে না বিবিএসের। তবে সবচেয়ে জরুরি হলো পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা। এজন্য বিবিএসের মৌলিক কিছু সংস্কার আবশ্যক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিবিএসের মূল্যস্ফীতির তথ্য নিয়েই জনমনে সবচেয়ে বেশি অবিশ্বাস রয়েছে, সেটি বিবিএস ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) পরিচালিত এক জরিপেও উঠে আসে। ‘ব্যবহারকারী সন্তুষ্টি জরিপ-২০২৪’ শীর্ষক ওই জরিপে দেখা গেছে, মোট ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বিবিএসের মূল্যস্ফীতিসংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। সংশয় রয়েছে বিবিএসের অন্য সব তথ্য নিয়েও। ২৬ শতাংশ মানুষ ন্যাশনাল অ্যাকাউন্ট পরিসংখ্যান নিয়ে সন্দিহান। অথচ এর মাধ্যমে জিডিপির হিসাব-নিকাশ করা হয়। এছাড়া ২৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ মানুষ আয় ও দারিদ্র্যের হিসাব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ মানুষের। ২৩ শতাংশের বেশি মানুষ শিল্প, শ্রম ও শিক্ষাবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ছিল বিবিএসের পরিসংখ্যানকে কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য করা যায়, সেটি সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় নেয়া। সংস্থাটির সংস্কারে টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে টাস্কফোর্স এতদিনেও তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে না পারার বিষয়টি হতাশাজনকও। বিবিএস সূত্র বণিক বার্তাকে জানিয়েছে যে কয়েক দিনের মধ্যেই বিবিএসের সংস্কার ঘিরে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত সুপারিশ অনুযায়ী উদ্যোগ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদন প্রকাশে খুব বেশি বিলম্ব না হোক এবং দ্রুত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হবে সেই প্রত্যাশা রয়েছে। তথ্যের ওপর যদি আস্থা না থেকে তবে তা কার্যকর নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।
বিবিএসের তথ্যের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হলে পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা আনা জরুরি। জনগণ পরিসংখ্যানে বাস্তবতার প্রতিফলন দেখতে চান। বাজারে চালসহ অন্যান্য দ্রব্যের যে ঊর্ধ্বগতি রয়েছে তার পরও মূল্যস্ফীতির হার কমার বিষয়ে সাধারণ মানুষ সন্দিহান। কেননা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতি হিটম্যাপ অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি হিসাবের ক্ষেত্রে চালের ভর ধরা হয় ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ গত বছরের আগস্টের তুলনায় এ বছরে আগস্টে মোটা ও সরু চালের দাম বেশি থাকলেও বিবিএসের হিসাবে এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তাই সংস্থাটির পরিসংখ্যান পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে পদ্ধতির যৌক্তিকীকরণও আবশ্যক।
মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে মূল্যস্ফীতির বাস্কেটে ৭৪৯টি পণ্য যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে এমন অনেক পণ্য রয়েছে, যা হয়তো কেউ জীবনে একবার ক্রয় করেন। আগে ৪২০টি পণ্য ছিল। কিন্তু এখন অনেক পণ্য থাকায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও তা মূল্যস্ফীতিতে তেমন প্রভাব ফেলে না। যদি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের হিসাবে মূল্যস্ফীতি প্রকাশ করা হয়, তাহলে এটা বর্তমান হারের কয়েক গুণ হয়ে যাবে। বাস্তবতা হলো, নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের মূল্য সবচেয়ে বেশি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। সুতরাং বাস্কেটের পণ্য নির্ধারণ নিয়েও পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা থাকে জিডিপির। বৈশ্বিকভাবে জিডিপির অনুপাতের সঙ্গে ঋণ কিংবা রফতানি থেকে শুরু করে রাজস্ব আয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নির্দেশকের তুলনা করা হয়। গত দেড় দশকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেননি দেশী-বিদেশী অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকরা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চূড়ান্ত হিসাবে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে। আর সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে জিডিপির আকার ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। এ সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের প্রায় পুরোটা সময় অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করেছে দেশের অর্থনীতি। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের মন্দার পাশাপাশি কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক ছিল না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির এ তথ্য অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। পদ্ধতিগত কোনো পরিবর্তন না করার কারণেই জিডিপির হিসাবেও তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সুতরাং প্রয়োজন হলো বিবিএস পরিচালিত প্রধান প্রধান জরিপসহ অন্যান্য পরিসংখ্যানগত কার্যক্রমের পরিচালনা পদ্ধতিকে যুগোপযোগী করা। দ্রুততম সময়ে তথ্য সংগ্রহ, সংকলন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যথাসময়ে তথ্য বা রিপোর্ট প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। কেননা দীর্ঘবিরতি দিয়ে বিবিএসের জরিপ পরিচালনা ও ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে কারচুপি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিবিএসে কর্মরত সব ধরনের জনবলকে পর্যাপ্ত দক্ষ করতে দেশ-বিদেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে বিবিএসকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। কোনোভাবেই তথ্য প্রভাবিত করতে দেয়া যাবে না। মনে রাখা প্রয়োজন, সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া সঠিক নীতি নেয়া যাবে না। আর নীতি যথাযথ না হলে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিই বাধাগ্রস্ত হবে।